নিন্দা:নিন্দার প্রকার : মানুষ নিন্দা কেন করে ?
অস্ত্র শরীরের বাহিরে আঘাত করে, কিন্তু কটূক্তি ও কুৎসা মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে। তাই কটূক্তি ও কুৎসা করার আগে এর দূরগামী পরিণাম নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত। কুৎসার আরেকটি সমার্থক শব্দ হলো "নিন্দা।"
নিন্দা:
নিন্দা শব্দের সাধারণ অর্থ— মিথ্যা-কুৎসা, কলঙ্ক, দোষারোপ, কটূক্তি ইত্যাদি। এটি হিংসুক মানুষদের দ্বারা পরিচালিত একটি ধ্বংসাত্মক দুষ্প্রচার (প্রপাগান্ডা) যুদ্ধ। যে ব্যক্তি মিথ্যাভাবে অন্যের নিন্দা করে, তাকে "নিন্দুক" বলা হয়।
নিন্দার প্রকারভেদ:
নিন্দা সাধারণত দুই প্রকার হয়—
১. ন্যায়/নীতি-বাচক নিন্দা:
যখন কেউ অন্যায়, অপরাধ বা দোষ করে, তখন তার সমালোচনা করা হয় ন্যায়বিচারের স্বার্থে। এটিকে নীতি বাচক নিন্দা বলা হয়।
ন্যায়সঙ্গত / নৈতিক সমালোচনা:
যখন কেউ অন্যায়, অপরাধ বা ভুল কাজ করে, তখন ন্যায় ও সমাজের কল্যাণের জন্য তার কৃত্যের সমালোচনা করা হয়। এ ধরনের সমালোচনাকে নৈতিক সমালোচনা বা ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা বলা হয়। এর উদ্দেশ্য ব্যক্তিকে অপমান করা নয়, বরং তার সংশোধন এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।
২. ঈর্ষাজনিত নিন্দা:
মানুষ যখন ঈর্ষাবশত মিথ্যা বা অযথা অন্যের নিন্দা করে, তখন তাকে ঈর্ষার নিন্দা বলা হয়। বর্তমানে সাধারণত মানুষ এ ধরনের নিন্দাকেই প্রধানত নিন্দা বলে বোঝায়।
ন্যায়সম্মতা সমালোচনা, যদি স্যাদ্ হিতকারিণী।
সা শুভা জনহিতায়ৈব, শুদ্ধভাবপ্রদর্শিনী॥
দ্বেষতো যদি বা নিন্দা, অসত্যদোষযুক্তকা।
সা নিন্দা নিন্দনীয়া স্যাত্, কীর্তিনাশপ্রদায়িনী॥
সত্যং হিতং চ যদ্ বাক্যং, সা নিন্দা শুভদা স্মৃতা।
অন্যথা যৎ কথং বাক্যং, সা নিন্দা বিষরূপিণী॥
ঈর্ষাপ্রসূত বদনাম:
যখন কেউ ঈর্ষা বা বিদ্বেষবশত কারো সম্পর্কে মিথ্যা বা অপ্রয়োজনীয় নিন্দা করে, তখন তাকে ঈর্ষাপ্রসূত বদনাম বলা হয়। আজকাল সাধারণত এই ধরনের বদনাম কেই নিন্দা বলা হয়। এর উদ্দেশ্য থাকে কোনো ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করা, তার উন্নতির জন্য নয়।
নিন্দার কারণ:
মানুষের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার, হিংসা, ঈর্ষা ও আত্মশ্লাঘা (আত্মপ্রশংসা)— এসবই নিন্দার মূল কারণ। যে ব্যক্তির মধ্যে এসব নেতিবাচক গুণ যত বেশি, তার নিন্দা করার প্রবণতাও তত বেশি।
মানুষ কেন নিন্দা করে?
হিংসুক ও নিন্দুকরা মনে করে, নিন্দা ও পরচর্চার মাধ্যমে তারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল বা মানসিকভাবে পরাজিত করতে পারবে। এছাড়া, নিন্দা করে এরা অলক্ষ্যে গর্ব ও মিশ্রিত তৃপ্তি অনুভব করে। এ কারণেই হিংসুক ও নিন্দুকরা নিন্দা করতে থাকে।
মানুষ জানে যে পরচর্চা ও পরনিন্দা মহাপাপ। তা সত্ত্বেও, নিন্দার আসক্তি অত্যন্ত সর্বনাশা।
বর্তমান সমাজে নিন্দার প্রভাব:
আজকাল পরনিন্দা ও পরচর্চা অনেকের কাছে প্রিয় ও জনপ্রিয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, তারা নাকি পরচর্চা না করলে খাবার হজম হয় না! কিন্তু বাস্তবে, নিন্দা ও পরচর্চা মানুষকে শুধুই শত্রু তৈরি করতে সহায়তা করে এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
গীতা–ভাগবতম অভ্যাস।
নিত্যং পাঠ্যতে গীতা-ভাগবতম্।
এতদ্ দ্বয়ং মুক্তিমোক্ষপ্রদম্॥
মা ত্যজ পাঠং গীতা–ভাগবতম্,
যাবৎ ন ভবত্যা আত্ম সাক্ষাৎকারঃ॥
(“মা ত্যজ” অর্থ “না ত্যজ” অর্থাৎ — “ত্যাগ করো না”)
সনাতন শাস্ত্রের নির্দেশনা:
সনাতন হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রমতে, যে ব্যক্তি অন্যের মিথ্যা নিন্দা করে, পরচর্চা করে, এবং অন্যকে তিরস্কার, ঘৃণা ও অপমান করে, সে নিজের পাপ বাড়িয়ে নেয় এবং বিনিময়ে নিজের অর্জিত পুণ্যকে বিনষ্ট করে। তাই মিথ্যা নিন্দা, পরচর্চা ও অপমান থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।

